বাঙালি ও বাংলার ইতিহাস
বাঙালির ইতিহাসের সূচনাঃ
১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ নয় মাস মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আজকের এই বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি। এতটা সহজ ছিলো না আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছি এই বস্তু যার নাম স্বাধীনতা।এক কথায় বলতে পারি স্বাধীনতা শব্দটি শহীদের রক্ত,মা বোনের ইজ্জত, পশুপাখি হত্যার মধ্য দিয়েই এসেছে। বুক ফুলিয়ে চলার সাহস পেয়েছি,পেয়েছি মাতৃভাষায় কথা বলতে।
যাই হোক, আমরা এখন দেখব আমাদের এই জন্মভূমি বাংলাদেশ প্রাক্কালে কেমন ছিল। এটা জানতে পারলে ইতিহাসের অর্ধেক জানা হয়ে যাবে কারন অর্ধেক ইতিহাস এখানেই নিহিত ছিলো।সবার আগে আমাদের এই মহাদেশ সম্পর্কে জানতে হবে এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর দিকে তাকাতে হবে।
বাঙ্গালি জাতির উৎপত্তি ও বিকাশঃ
বাঙালী জাতিকে আমরা সহজেই দুটি দলে বিভক্ত করতে পারি, তা শারীরিক গঠন হোক বা পাঠ, খাদ্যাভ্যাস, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি। তারা হল ১.আর্য এবং ২.অনার্য। আবার এই আর্য শ্রেণীকে ৪টি দলে ভাগ করা যায় যেমন: অস্ট্রিয়ান, দ্রাবিড়, ভোটচিনিয়ান, নেগ্রিটো। কথিত আছে যে এই অস্ট্রিয়ান জাতি প্রায় 6000 বছর আগে ইন্দোচীন থেকে বাংলায় প্রবেশ করে এবং নেগ্রিটোদের পরাজিত করে শাসন করতে শুরু করে। কিছুকাল পরে, দ্রাবিড়রা পাকিস্তানে অবস্থিত খাইবার নামক একটি গিরিপথ অতিক্রম করে বাংলায় আসে। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে সেই সময়ে অস্ট্রিয়ান ও দ্রাবিড় জাতির মধ্যে সম্প্রীতি বিদ্যমান ছিল। পরে, অস্ট্রিক এবং দ্রাবিড় জাতিগুলির একত্রিত হয়ে আর্য জাতি গঠিত হয়েছিল। বলে রাখা ভালো যে আর্যরা বাংলায় প্রথম আগমন করেছিল খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে। আর তাদের আগমনের আগে ভাষা ছিল অস্ট্রিয়ান, কিন্তু আর্য জাতির কারণে সেই ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যায়। সব মিলিয়ে বলতে পারি বাঙালি জাতি কোনো বিশেষ জাতি থেকে তৈরি নয়। তাই বাঙালি জাতি সংকর এবং বাংলা ভাষাও তাই।
বাংলা শব্দের উৎপত্তি ও বিকাশ:
প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর একটি নির্দিষ্ট ভাষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি রয়েছে। বাঙালিদের একটি স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে এবং ছিল। কিন্তু প্রাচীনকাল থেকেই এটি একটি ভাষা হিসেবে পরিচিত ছিল কারণ বাঙালি জাতি নিজেই একটি সংকর জাতি। তবে আমরা দেখি কিভাবে বাংলা, বঙ্গ শব্দগুলো এসেছে। সম্রাট আকবরের শাসনামলে সমগ্র বাংলা অর্থাৎ "বাংলাদেশ" "সুবাহ ই বাঙ্গালাহ" নামে পরিচিত ছিল। ফারসি বাংলা থেকে আমরা পর্তুগিজ বাংলা এবং পরবর্তী ইংরেজি বাংলা শব্দ আমরা পাই। সম্রাট আকবরের সাবাসদ আবুল ফজল তার আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে বাংলাকে দেশবাচক হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং তিনি দেখান যে বাংলা হল একটি দেশের নাম যা পূর্বে এদেশের অন্তর্গত ছিল। এছাড়াও ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন বলেছেন যে বঙ্গ শব্দটি ঐতরেয় আরণ্যক-এ পাওয়া যায়। কথিত আছে, এ দেশে চাষাবাদের জন্য দুটি ক্ষেতের মধ্যে একটি রেখা টেনে আল নামক মাটি দিয়ে তাতে বঙ্গ শব্দ যোগ করা হয় এবং অবশেষে বাঙ্গাল শব্দটি আসে। আর মুলকাই শব্দের অর্থ দেশ তাই তার ব্যাখ্যা অনুসারে মুলক ই বাংলা থেকে বাংলাদেশের নামকরণ করা হয়েছে।
বাংলার জনপদসমূহ :
জেলা, থানা, বিভাগ, গ্রাম ইত্যাদি 5000 সালের আগে বা তার আগে প্রচলিত ছিল না। তখন একটি শহর ছিল যাকে আমরা আজ জেলা বা বিভাগ হিসাবে চিনি। আজকের বর্ধমান, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সবই ছিল গৌড় জনপদের অধীনে। বাংলা মানে আজকের ঢাকা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, যশোর ইত্যাদি বৃহত্তর বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর পুন্ড্রের অধীনে ছিল। হরিকলের অন্তর্ভুক্ত ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা, সিলেট। সমতট ছিল বৃহত্তর কুমিল্লা, নোয়াখালীর অংশ। চন্দ্রদ্বীপ ছিল বরিশাল। কামরূপ ছিল আসামের একটি অংশ। তাম্রশাসন ছিল মেদিনীপুর যা প্রাচীনকালে মিধুনাপুর নামে পরিচিত ছিল। আরকান ছিল মিয়ানমারের কক্সবাজারের অংশ। এছাড়াও আরও অনেক জনপদ ছিল যা ইতিহাসে থাকতে পারে বা নাও থাকতে পারে।
প্রাচীন বাংলার ধর্মঃ
আর্যযুগে দেব-দেবী ও গ্রাম দেবতার প্রভাব ছিল। আর্যরা সাধারণত পূজা পার্বণে বিশ্বাস করত। তারা করত রথযাত্রা, দোলযাত্রা, স্নানযাত্রা। এ থেকে স্পষ্ট যে আর্যরা হিন্দু ধর্মের অনুসারী ছিল। সেই সময়ে অর্থাৎ বৈদিক যুগে ব্রত বেশি প্রচলিত ছিল, কোমাদের ধর্মঠাকুর নামে এক দেবতা ছিলেন। রাজদেশে ধর্মপূজা প্রচলিত ছিল। এছাড়াও তারপর মনসাপুজো শারদোৎসব, ঘটলক্ষী, ষষ্ঠীপুজো। ষষ্ঠ শতাব্দীতে ব্রাহ্ম রাজবংশের প্রভাবে তাদের বৈদিক ধর্মের বিস্তার ঘটে। পাল যুগে বৌদ্ধধর্ম প্রভাবশালী ছিল এবং সেন রাজবংশের সময় ব্রাহ্মণ্যবাদ বেশি প্রভাবশালী ছিল। উল্লেখ্য যে, সে সময় পুরাণধর্ম, বৈঞ্চবিবাদ, শৈবধর্ম ও সহজিয়া ধর্মের প্রভাব ছিল লক্ষণীয়।
প্রাচীন বাংলার শিক্ষা ও জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার আলো:
প্রাচীনকালে জ্ঞান বিজ্ঞানের তথ্য সেভাবে পাওয়া যেত না, কিন্তু যা পাওয়া যায় তা থেকে বলতেই হবে যে, বেদের তথ্যে প্রাচীন বাংলার তথ্য সেভাবে পাওয়া যায়নি। -ব্রাহ্মণ-উপনিষদ, ধর্মশাস্ত্র, ধর্মসূত্র ইত্যাদি মৌর্য যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা বেশি পরিলক্ষিত হয়। নালন্দার মহাবিহারের মাধ্যমে আমরা 6 ও 7 শতকে বিজ্ঞান ও শিক্ষার সাথে বাংলার সম্পৃক্ততা দেখতে পাই। ধীরে ধীরে ব্যাকরণ, অভিধান, গণিত, ধর্মচর্চা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অবদান স্বীকৃত।
উপসংহার:
চিন্তা, বিচার, বুদ্ধিমত্তা, বিবেচনায় বাঙালি জাতি এগিয়ে। মেধার মানসিকতার ভিত্তিতে বাঙালিরা সর্বত্র এগিয়ে। বাঙালিরা মিশ্র জাতি, বাঙালিদের মধ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের মানুষ পাওয়া যায়। বাঙালির ইতিহাসের শেষ নেই। তাই পরিশেষে বলবো আমি একজন বাঙালি হিসেবে গর্বিত।প্রতিটি মানুষকে তার জন্মভূমিকে নিয়ে গর্ব করা উচিত





মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন